শান্তিনিকেতন থেকে বিশ্বভারতী: বিশ্বমানবতার বিশ্ববিদ্যালয়

Santi-Nikaton-NM24.jpg

নোয়াখালী মেইল অনলাইন ডেস্ক ।।

বাংলা তথা ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে ১৮৮৮ সাল এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক। ১৮৮৮ সালের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেন । এই বছরেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের ভিত্তি স্থাপন করেন- এক আশ্রম, এক বিদ্যালয়, এক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বরং মানবতার এক জীবন্ত প্রতীক।

কিন্তু এর সূচনা আরও আগে- ১৮৬৩ সালে, যখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বীরভূম জেলার বোলপুরের কাছে রায়পুরের জমিদার ভুবনমোহন সিনহার কাছ থেকে ২০ বিঘা জমি ক্রয় করে প্রতিষ্ঠা করেন একটি আশ্রম। এই আশ্রমের উদ্দেশ্য ছিল—জাগতিক কর্মব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে আত্মিক সাধনা ও প্রার্থনায় সময় কাটানোর জন্য একটি নির্জন আশ্রয় গড়ে তোলা।
পরে দেবেন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট গঠন করেন, যেখানে ছিল অতিথি ভবন, প্রার্থনাকক্ষ ও ধর্মীয় গ্রন্থাগার—আধ্যাত্মিকতার এক শান্ত পরিমণ্ডল।

রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন: শিক্ষা ও জীবনের নতুন দিগন্ত
১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ এই আশ্রমেই শিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন একটি আদর্শ বিদ্যালয়-যা পরে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার নতুন ধারণার সূচনা করে। শিলাইদহে দশ বছর জমিদারি পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন গ্রামের মানুষের জীবন, তাঁদের বঞ্চনা ও প্রজ্ঞা—সেখান থেকেই জন্ম নেয় তাঁর চিন্তা: শিক্ষা কেবল পাঠ্যপুস্তক নয়, জীবনবোধের বিষয়।

তাঁর কাছে শান্তিনিকেতন ছিল তিনটি স্বপ্নের মিলনস্থল:
১। প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিশুদের বেড়ে ওঠা,
২। শহর ও গ্রামের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা,
৩। এবং মানবজাতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে এক সর্বজনীন চেতনার বিকাশ।
তিনি চেয়েছিলেন এমন এক বিদ্যালয়, যেখানে শিশুরা গাছতলায় বসে, প্রকৃতির মাঝে থেকে শেখাবে এবং শিখবে—শুধু জ্ঞান নয়, সহানুভূতি, বন্ধুত্ব ও সৃষ্টিশীলতা।

শান্তিনিকেতন থেকে বিশ্বভারতী: বিশ্বমানবতার বিশ্ববিদ্যালয়
স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া এই বিদ্যালয় ক্রমেই বিকশিত হয় এক মহত্তর রূপে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯২১ সালে, রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়—যার মূলমন্ত্র “যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্” — অর্থাৎ “যেখানে বিশ্ব এক নীড়ে মিলিত হয়”।

রবীন্দ্রনাথ ১৯১৬ সালে তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন-
“পৃথিবীর সঙ্গে ভারতকে সংযুক্ত করার সূত্র হিসেবে শান্তিনিকেতনকে গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় অন্ধ স্বদেশপ্রেমের কুন্ডলী থেকে বিশ্বকে মুক্ত করাই হবে আমাদের লক্ষ্য।”

তাঁর শিক্ষা ধারণা ছিল বিশ্বজনীন মানবতাবাদে ভরপুর। তিনি চেয়েছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বিশ্বের সংস্কৃতিগুলির মিলন ঘটাতে—যেখানে বৈদিক, বৌদ্ধ, ইসলামি, পাশ্চাত্য, সব ধারার জ্ঞান মিলেমিশে গড়ে তুলবে এক সামগ্রিক বিশ্বচেতনা।

শান্তিনিকেতন ও শ্রীনিকেতন: জ্ঞানের সঙ্গে কর্মের মেলবন্ধন
বিশ্বভারতীর কাঠামোয় তিনি যুক্ত করেন শ্রীনিকেতন—এক গ্রামীণ পুনর্গঠন কেন্দ্র। এখানে কৃষিবিদ, চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদেরা গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করতেন, আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা দিতেন। ‘ব্রতী বালক সংগঠন’ নামে এক স্কাউট আন্দোলন শুরু হয়—যুব সমাজকে কর্মমুখী ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল করে তোলার লক্ষ্যে। শিক্ষা ও জীবন, শহর ও গ্রাম, সংস্কৃতি ও কর্ম—সবকিছুর এক সেতুবন্ধনই ছিল শান্তিনিকেতনের মূল দর্শন।

ত্যাগ, দান ও আত্মনিবেদনের ইতিহাস
শান্তিনিকেতনের সূচনা হয়েছিল মাত্র পাঁচজন ছাত্র ও অতি সীমিত সম্পদ নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী বিদ্যালয়ের খরচ চালাতে নিজের সমস্ত গহনা বিক্রি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিক্রি করেছিলেন তাঁর পুরীর বাংলো, এমনকি তাঁর নোবেল পুরস্কারের সমস্ত অর্থ দান করেছিলেন বিশ্বভারতীর জন্য।

পরে ইংল্যান্ডের সি.এফ. এন্ড্রুজ, লিওনার্ড এমহার্স্ট, আমেরিকার ডরোথি স্ট্রেইট, ভারতের ত্রিপুরা ও বরোদা রাজপরিবার—অসংখ্য মানুষ যুক্ত হন এই মহান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকাশে।

শান্তিনিকেতন আজও ধারণ করে রবীন্দ্র-দর্শনের আলো
১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ দেহত্যাগের পর ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। আজও এর প্রতিটি ভবন—পাঠভবন, কলাভবন, সঙ্গীতভবন, বিদ্যাভবন, চীনাভবন, রবীন্দ্রভবন—ধরে রেখেছে কবিগুরুর মানবতাবাদ, শিল্পচেতনা ও আত্মিক সাধনার প্রতিধ্বনি।

শান্তিনিকেতন কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক আদর্শ জীবনদর্শন:
যেখানে শিক্ষা মানে কেবল পেশা নয়, বরং জীবনের সৌন্দর্য, মানবতার উপলব্ধি, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা। আজকের এই দিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে— যাঁর শান্তিনিকেতন শুধু বাংলার নয়, সমগ্র বিশ্বের এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। “যত্র বিশ্বম্ ভবত্যেকনীড়ম্” — এই মন্ত্র আজও মানবসভ্যতার জন্য এক শাশ্বত বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top