আস্থার সংকট এবং অবিশ্বাসের ছায়া সর্বত্র, বিশ্বাস শব্দটি আজ মূল্যহীন

Vasani.jpg

মিয়া মোহাম্মদ মাকসুদ ।।

বিশ্ব আজ নানামুখী সংকটে। মানুষ হিসেবেও আমরা প্রতিদিন নানামুখী সংকটের মুখোমুখি হই বা হচ্ছি। কিন্তু সারা পৃথিবীতে অর্থাৎ আমাদের এই সভ্যতা আজ একটি কমন সংকটে রয়েছে। সেটা হলো আস্থার সংকট। পৃথিবী নামক এই বসবাসযোগ্য গ্রহটি সৃষ্টির শুরু থেকেই সভ্যতা ক্রমোন্নতিতে ধাবমান।

মানুষের এই অগ্রযাত্রায় সাথী হয়েছে প্রযুক্তি। আমাদের এই যে আজকের চাল-চলন, বিলাসিতা, আরাম-আয়েশ অথবা আরাম আয়েশের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা, সেই প্রচেষ্টা হিসেবে পেছন দিয়ে পকেট বোঝাই করতেও পিছপা হচ্ছি না তারও পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি। কেউ ঠাণ্ডা পানি পান করার জন্য একটি ফ্রিজ কেনার চেষ্টা করছেন আবার কেউ ঘরটা ঠাণ্ডা করার জন্য এসি কেনার চেষ্টা করছেন। অথচ আমাদের অনেকের আয়ই সে অবস্থায় থাকে না। এই আরামের জন্য কেউ কেউ পেছন দরজার আশ্রয় নেন বটে, তাতে কিন্তু তার ইমেজ সংকটে পড়ে এটা তিনি সে অবস্থায় বুঝতেও পারেন না।

কারও গাড়ি চাই, কারও বাড়ি চাই। কারও অর্থ সংকট আবার কারও বা ইমেজ সংকট। নানামুখী সংকটে বিভক্ত মানুষ। আবার কার কি সংকট সেটা অনেকেই টেরও পাচ্ছে না। যখন বুঝতে পারছে তখন সেই সংকট থেকে ফেরার পথ থাকছে না। ব্যক্তি বিশেষে এবং দেশভেদে সেই সংকট বহুমুখী ও ভিন্ন। কোথাও সম্পদের সংকট। আবার কোথাও রাজনৈতিক সংকট। এরকম বহুমুখী সংকটের কথা শেষ হয় না।

আমি বলেছি আস্থার সংকটের কথা। আস্থা বলতে আমরা কি বুঝি? আস্থা হলো আমাদের অন্তর্নিহিত বিশ্বাস। একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে বিশ্বাস করবে। মানুষ হিসেবে এটাই স্বাভাবিক। এটাই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সব জায়গাতেই ভাঙনের সুর বাজছে। নদীতে যে ভাঙন সৃষ্টি হয়, তা কোনোভাবে আমরা ঠেকাতে পারছি কিন্তু আমাদের সমাজের সর্বত্র যে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে পরিত্রাণের উপায় জানা নেই কারো। আর জানা থাকলেও তা আজ প্রয়োগ করা কষ্টসাধ্য। কারণ সমাজের গোড়া থেকে যে ব্যবধান গড়ে উঠছে সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেই ব্যবধান কেবল বাড়ছে-বৈ কমছে না। পিতা-মাতার সাথে সন্তানের ব্যবধান, অমানবিকতার সাথে মনুষ্যত্বের ব্যবধান।

ওই যে আমাদের আস্থার সংকট রয়েছে। আমি যার ওপর আস্থা রেখে নিশ্চিত হয়েছি দেখা গেল সেই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নিয়ে যা সর্বনাশ করার করে যাচ্ছে। আমি যাকে জ্ঞানী বলে মেনে নিচ্ছি তখন দেখা যাচ্ছে তিনি আসলে মুখোশ পরা একজন মানুষ। যখন সেই সর্বনাশের কথা জানতে পারছি তখন আর কতটুকু করার থাকছে? ততদিন তো অনেক কিছুই শেষ।

আমার ধর্মীয় অনুরাগকে পুঁজি কেউ কেউ রাজনৈতিক পায়দা নেয়ার চেষ্টা করছে । এরা ধর্ম আর রাজনীতিকে এক জায়গায় নিতে প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছে। আমার বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় প্রতিনিয়ত আঘাত হানছে। এভাব না এভাবে। এটা বে-দাত এটা করা যাবে না। মানুষের হাজার বছরর বিশ্বাসকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা নিতে পাল্টে দিচ্ছে।

এর বাহিরেও আস্থার সংকটের মূল কারণ হলো আমরা কারো আস্থার প্রতিদান দিতেই ভুলে গেছি। পৃথিবীতে বড় বড় বেঈমান রয়েছে। ইতিহাসের পাতায় মানুষের ঘৃণায় তাদের ঠাঁই হয়েছে। ব্রুটাসের কথা জানি। মীরজাফরের কথা জানি। সমাজে তা আরও বেড়েছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে অবিশ্বাস। আরও উদাহরণ আছে। আর আস্থার এই সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হয়েছে। অবিশ্বাস ছড়িয়েছে সমাজের অলিতে গলিতে। এমনকি এই অনাস্থা ঢুকে গেছে পরিবারের ভেতর। কে যে কার পেছনে দাঁড়িয়ে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে অনেক কাছে থেকেও সেটা বোঝা যায় না। ফলে এখন কেউ সচরাচর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। বিশ্বাস শব্দটি আজ মূল্যহীন।

সমাজ ও পরিবারে আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে । একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আজ স্বামী, স্ত্রী আর সন্তানের বাইরে পরিবার হয় না। এই শ্রেণির পরিবারের ভেতরেও দ্বন্দ্ব, অবিশ্বাস বাসা বাঁধছে। পারিবারিক হত্যাকাণ্ড বা নৃশংসতার খবর আমরা যে দেখি তা কেন বাড়ছে। কেন স্বামী তার স্ত্রীকে ভুল বুঝছে অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে।

কেন আমরা একজন অন্যজন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রতিদিন এই যে সংসার ভাঙার সুর বাজছে তা কি আমাদের বয়ে চলা রীতিনীতির সাথে খাপ খায়। ভিনধারার সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করে, নিজ ধারার সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে আমরা যে সুখ খুঁজতে ব্যস্ত রয়েছি- সেই ভিন ধারার সংস্কৃতির ওপর বিশ্বাস বা আস্থার আমাদের সমাজ আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।

যে বিশ্বাস আমাদের অন্তরের শক্তি বৃদ্ধি করে। আজকের দৈনন্দিন জীবনের দিকে দেখলে দেখা যায়, সর্বত্রই অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। স্বামী প্রিয়তমা স্ত্রীকে বিশ্বাস করছে না অথবা স্ত্রী তার স্বামীকে বিশ্বাস করছে না। যে ভাই বা বোনের সাথে একসাথে খেলাধুলা করে বড় হয়েছি, সেই ভাই বা বোনের সাথে সৃষ্টি হচ্ছে বিশাল দূরত্ব। সেই দূরত্ব থাকছে মৃত্যু পর্যন্ত। সেই সাথে আমাদের ধৈর্যশক্তি কমেছে। ফলে বাড়ছে বিচ্ছেদ। প্রতিদিন বাড়ছে বিচ্ছেদের সংখ্যা। এগুলো সব আস্থার সংকট। এর থেকে আমরা বের হতে পারি কিভাবে তার পদ্ধতি কারো জানা নেই। আমরা কেবল ছুটছি।

বিজ্ঞানের অগ্রগতি আমাদের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। সামনের দিকে ক্রমাগত ছুটতে গিয়ে আমরা যে কি পেছনে ফেলে আসছি তা খেয়াল করার সুযোগ থাকছে না। আমাদের বিবেকের কাছে, নৈতিকতার কাছে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছি। এসব কেন করছি, এসব করে কি আদৌ কোনো লাভ হচ্ছে আমাদের? আর কার জন্যই বা করছি। আমরা মনুষ্যত্ব বিক্রি করে যে বিশ্বাসঘাতকতার উদাহরণ সৃষ্টি করছি, তা একসময় বুমেরাং হয়ে আমাদের কাছেই ফিরে আসবে। হয়েছেও তাই।

মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার ফলে বাংলা তার স্বাধীনতা হারিয়েছিল। আমরা প্রায় দুইশ বছর ব্রিটিশদের স্বাধীনতার নাগপাশে ছিলাম। যেখান থেকে ক্ষুদিরাম বসু, বাঘা যতীন, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, শেরেবাংলা, সৌওরার্দ্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবের মতো অসংখ্য স্বাধীনতাকামী বীরদের উৎসর্গ করা জীবন আর রক্তের বিনিময়ে মুক্ত হয়েছিলাম।

এত বিসর্জনের অর্জনে তাহলে কি লাভ হয়েছিল। সেই-ই তো ঘুরে ফিরে বিশ্বাসঘাতকতা! আসলে বিশ্বাস বা আস্থা এমনই একটি অর্জন যা মানুষকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। মনুষ্যত্বের স্বাদ নিতে হলে আস্থা অর্জন করা অবশ্যম্ভাবী।

সভ্যতার শুরু থেকে গতকাল পর্যন্তই সমাজ চলছে সমাজের গতিতেই। আজো চলছে। কিন্তু আগামীকাল! সমাজের পরিবর্তন হয় আমাদের আচরণের দ্বারা। মাত্র কয়েক দশক আগেও যে সমাজ ব্যবস্থা ছিল সেখানে যে সামাজিক আচরণগুলোর বাধ্যবাধকতা ছিল আজ আর সেই বাধ্যবাধকতা থাকছে না।

সময়ের প্রয়োজন ভেবে আমরাও ঢিলে দিয়েছি। আমরা আমাদের নৈতিকতার অবক্ষয়ের কথা বলছি না। যেমন- সমাজে গুরুজনদের সম্মানের বিষয়টি। আজ কতজন উঠতি বয়সী তরুণ বা তরুণী তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মুরুব্বিস্থানীয় ব্যক্তিকে সম্মান করছে। দেখা যাচ্ছে, খুব পরিচিত না হলে তার সামনেই সিগারেট টানছে। অথচ একসময় এটা ছিল কল্পনাতীত। কেউ সময়ের পরিবর্তনের দোহাই দিয়ে এটা মানতে বলতে পারেন।

কিন্তু এই মেনে নেয়ার প্রবণতা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে নিজেই একসময় আর মানতে পারবেন না। কারণ একই ঘটনার মুখোমুখি আমি আপনিও হতে পারি। এটা হলো সমাজের একজনের প্রতি অন্যজনের বিশ্বাস বা আস্থা। আমি কাউকে সম্মান করতে পারি বা করবো এই আস্থাটুকু অর্জন করতে পারলেই, আমি নিজেও সম্মান আশা করতে পারি। নচেৎ নয়।

বিশ্বাস করা আজ খুব কঠিন ব্যপার এটা একদম ঠিক। ঘরে ঘরে সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। কেন আছে, কারণ আস্থা বা বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব! অথবা এর চেয়েও আধুনিক প্রযুক্তি আছে যা থেকে আমি কখনোই ফাঁকি দিতে পারবো না। আসলে আমরা ফাঁকি দিতে খুব পারদর্শী। নিজের কাজে গাফিলতি করাই যেন আমাদের দায়িত্ব! তবে সবাই নন, তবে তা যে অনেক সেটা বলা যায়। তাই তো কাজের সময় কে কি করছে তা জানার এত আগ্রহ! কাজের সময় যদি সবাই একাগ্রমনে কাজই করতো তাহলে কি এত সমস্যা হতো? হতো না। আস্থা হারিয়ে আজ আমাদের এই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এখান থেকে ফেরার কোনো উপায় নেই। ফিরতে হলে পরিবার থেকে সেই শক্তি অর্জন করতে হবে। না হলো আস্থার সংকট কাটবে না কোনোদিন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top