প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন হস্তান্তর করছে।
বিশেষ প্রতিবেদক ।।
একজন মালিকের একাধিক গণমাধ্যম প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে বলে মনে করে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। তাই এক উদ্যোক্তার একটি গণমাধ্যম রাখার সুপারিশ করেছে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। ২২ মার্চ শনিবার বেলা ১২টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশনের রিপোর্ট হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে গণমাধ্যমের জন্য ২০টি মূল সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, বৈশ্বিক উত্তম চর্চা হচ্ছে গণমাধ্যমের কেন্দ্রীকরণ যেন কোনোভাবেই ঘটতে না পারে, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ। কমিশন মনে করে, আমাদেরও অচিরেই অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। ক্রস-ওনারশিপ নিষিদ্ধ করে অর্ডিন্যান্স জারি করা যায় এবং যেসব ক্ষেত্রে এটি বিদ্যমান, সেগুলোতে পরিবর্তন আনার নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তাদের ব্যবসা পুনর্গঠনের লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া প্রয়োজন। এগুলো নানা পদ্ধতিতে হতে পারে। যেসব কোম্পানি/গোষ্ঠী/প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তি/
পরিবার একইসঙ্গে টেলিভিশন ও পত্রিকার মালিক তারা যেকোনও একটি গণমাধ্যম রেখে অন্যগুলোর মালিকানা বিক্রির মাধ্যমে হস্তান্তর করে দিতে পারে। অথবা দুইটি মিডিয়ার (টেলিভিশন ও পত্রিকাকে) সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একত্রিত করে আরও শক্তিশালী ও বড় আকারের একটি মিডিয়া (টেলিভিশন অথবা দৈনিক পত্রিকা) পরিচালনা করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ বিনষ্ট করে- এমন ব্যবস্থার অবসান হওয়া দরকার। একক মালিকানায় একই ভাষায় একাধিক দৈনিক পত্রিকা বা একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল প্রতিযোগিতার পরিবেশ নষ্ট করে। সেইসঙ্গে গণমাধ্যমের যে প্রভাবক ক্ষমতা, তা নিজ স্বার্থে কেন্দ্রীভূত করে। সে কারণে এই ব্যবস্থার অবসান হওয়া দরকার। বিদ্যমান এ ব্যবস্থার দ্রুততম সমাধান করতে হবে। একই সাবান একাধিক মোড়কে বাজারজাত করা যেমন বাজারের প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে, একই মালিকানায় একই ভাষায় একাধিক দৈনিক পত্রিকাও গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতাকে নষ্ট করে এবং পাঠক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেলিভিশনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ‘এক উদ্যোক্তার একটি গণমাধ্যম (ওয়ান হাউজ, ওয়ান মিডিয়া)’ নীতি কার্যকর করাই গণমাধ্যমে কেন্দ্রীকরণ প্রতিরোধের সেরা উপায়। গণমাধ্যমের মালিকানায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে মানুষ জেনেশুনে তার পছন্দ বেছে নিতে পারে। তাছাড়া এতে গণমাধ্যমে কালো টাকার অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে প্রতিবছর তার আর্থিক হিসাব উন্মুক্ত করতে হবে, যাতে তার আয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
সুপারিশে বলা হয়, সাংবাদিকদের ইউনিয়ন, সংঘ বা সমিতিগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় স্বাধীন। তবে সাংবাদিকদের ইউনিয়ন ছাড়াও নানা কারণ ও উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। একই জেলা বা উপজেলায় একাধিক প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে বিভাগ ও এলাকাভিত্তিক সাংবাদিক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিছু সংগঠন রাজনীতিকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য ক্ষমতা তোষণে লিপ্ত বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পটভূমিতে সৃষ্ট পরিস্থিতি সাংবাদিকতা পেশার জন্য শুধু অপ্রীতিকরই নয়, বরং স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য বড় অন্তরায়। তাই ইউনিয়ন ছাড়া অন্যান্য সংগঠনকে সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসাবে স্বীকৃতি না দেওয়ার অধিকার সরকার বা অন্য সব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় কোনও সুযোগ-সুবিধা এসব সংঘ-সমিতির প্রাপ্য নয়। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানও এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে বলে কমিশন আশা প্রকাশ করে।
এছাড়া গণমাধ্যমের কলাম লেখক, প্রদায়ক শিল্পী ও অতিথি উপস্থাপক/আলোচকদের সম্মানির ওপর যে অগ্রিম কর নেওয়া হয়, তা সৃজনশীলতার ওপর করারোপের সমতুল্য। এই অগ্রিম কর রহিত করা উচিত বলে মনে করে কমিশন।