দেশ গড়ায় তিন প্রজন্মের ভাবনার সমন্বয়ে করতে চায় বিএনপি

BNP-2026.jpg

আগামী সপ্তাহে ইশতেহারে ঘোষণা আসছে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ডসহ আট বিষয়ে প্রাধান্য, শিক্ষা, শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব যোগসূত্র দলটি।

বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ রূপকল্প এবং তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে এবার রেইনবো নেশন’ বা ‘রংধনু জাতি’ গঠনে ‘নির্বাচনী ইশতেহার’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফাকে ভিত্তি ধরে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে বাস্তবধর্মী এই ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ ব্যাপারে দু-এক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত বৈঠক হবে। এরপর আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে দলীয় সূত্র জানায়। এতে তিন প্রজন্মের ভাবনার সমন্বয় ঘটবে।

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্য জানান, এবারের ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়ন ও তরুণ প্রজন্মের চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেকে শুরু করে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং বেকার ভাতা চালুর প্রতিশ্রুতি থাকছে নির্বাচনী ইশতেহারে। আটটি মৌলিক বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।

এগুলো হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, হেলথ কার্ড, জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষা, শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ক্রীড়া ও ধর্ম। বাসযোগ্য, আধুনিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে নানা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ারে গুরুত্ব দিয়ে চায় দলটি।

‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘দিল্লি নয় পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’—এ ধরনের স্লোগান থাকতে পারে বলে ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির আলোচনায় উঠে এসেছে।

দলের পক্ষ থেকে লিফলেট আকারে এসব ভোটারের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এসব ভাবনার কথা। এবারের ইশতেহার শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, বিএনপির এই পরিকল্পনা সাধারণ মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করবে। কারণ সমাজের শোষিত, নিষ্পেষিত মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য নিশ্চয়তা চায়। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ যে পরিকল্পনার কথা তারেক রহমান তুলে ধরছেন, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে এগিয়ে চলছে বিএনপি। এ যাত্রায় দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি যে বিএনপির হাল ধরেছেন তারেক রহমান। দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনে দেশ ও জাতির জন্য ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ নিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করছেন তারেক রহমান। সেই ভাবনায়ই প্রণয়ন হচ্ছে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা।

বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলছে। ফ্যামিলি কার্ডটি মূলত পরিবারের প্রধান নারীর নামে দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে মাসে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। এতে পরিবারগুলোর কিছু টাকা সঞ্চয় হবে। সেই সঞ্চয়ের মাধ্যমে নারী সদস্যের নেতৃত্বে আয়ের ছোট উদ্যোগ শুরু করা সম্ভব হবে; যা হবে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষার একটি স্থায়ী পথ।

বিএনপির পরিকল্পনায় কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা স্বল্প মূল্যে সার, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তি পাবেন। পাশাপাশি সহজে ঋণ এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, কৃষকের আয় বাড়বে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হবে।

বিএনপি প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেবে। হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সব তথ্য লিপিবদ্ধ করে রাখা হবে এবং সারা দেশে শক্তিশালী প্রাইমারি হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। স্বাস্থ্য খাত নিয়ে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচসি) আদলে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ প্রতিটি নাগরিককে দেবে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা। চিকিৎসাসেবা আরো উন্নত করার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি (এক থেকে তিন বছর), মধ্যমেয়াদি (এক থেকে পাঁচ বছর) ও দীর্ঘমেয়াদি (১০ বছর পর্যন্ত) প্রতিশ্রুতি থাকছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে প্রাধান্য পাবেন নারীরা। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরনের অন্তত এক লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী।

চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির। প্রাথমিক শিক্ষায় বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। প্রাথমিক থেকে দক্ষ করতে তুলতে বাংলা, ইংরেজি ভাষার বাইরেও একাধিক ভাষা শেখানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষকদের অবস্থান ও আর্থিক সুরক্ষা উন্নত করা হবে। পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের বাস্তব যোগসূত্র তৈরি করা হবে, যেন শিক্ষার ফলটা বাস্তবে চাকরি ও উদ্যোগের ক্ষেত্রে কাজে লাগে।

জোনভিত্তিক শিল্পায়নে বিএনপির পরিকল্পনায় রয়েছে ইপিজেড-কেইপিজেডের মতো অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। শিল্পকে আধুনিক শিল্পে রূপান্তর করা হবে। এসএমই, ব্লু ইকোনমি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং আইসিটি খাতে ব্যাপক নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করা হবে, যাতে পরিবারে আয় বাড়ে ও অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হয়।

ক্রীড়াকে শুধু শখ নয়, পেশা হিসেবেও গ্রহণযোগ্য করতে বিএনপি সর্বস্তরে খেলাধুলার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবে। স্কুল ও কলেজে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা হবে এবং পর্যাপ্ত ক্রীড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে।

বিএনপি নবায়নযোগ্য শক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং বাড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করবে। পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এবং মৌসুমি বন্যা থেকে মানুষকে রক্ষা করতে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে।

বিএনপির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মের পুরোহিত, পাদ্রিসহ ধর্মীয় নেতারা মাসিক ভিত্তিতে সম্মানি পাবেন, যাতে তাঁদের জীবনমান উন্নত হয়।

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা জানান, সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক বিষয়ে মূলনীতি ধরে আটটি মৌলিক বিষয় সামনে এনে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে, যার ভিত্তি ধরা হয়েছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা। ‘রেইনবো নেশন’ বা ‘রংধনু জাতি’ গঠনে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষিত ভিশন-২০৩০ রূপকল্প এবং তারেক রহমান ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে মূলত তিন প্রজন্মের ভাবনার সমন্বয়ে বিএনপি এই নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করছে।

এ ব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মিডিয়াকে বলেন, ‘বিএনপি ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফাকে মূল ভিত্তি ধরে নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হবে। এখনো তৈরি হয়নি, হলে বিস্তারিত জানতে পারবেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার এখনো আমরা চূড়ান্ত করিনি। খুব শিগগির চূড়ান্ত করা হবে।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘ইশতেহার নিয়ে আমাদের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেখানে কিছু বিষয়ে অগ্রাধিকার থাকবে। কিছু স্বল্পমেয়াদি, কিছু মধ্যমেয়াদি, কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘মূল ফোকাস স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও পরিবেশে। জিয়াউর রহমানের খাল কাটা কর্মসূচি আরো ব্যাপকভাবে চালু করে পানি ধরে রাখা, এর মাধ্যমে পানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্য ও বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ডা. মাহদী আমিন মিডিয়াকে বলেন, ‘এবারের ইশতেহার কোনো গতানুগতিক ধারায় হবে না। জীবনমুখী ও বাস্তবধর্মী ইশতেহার ঘোষণা করা হবে। ইশতেহার ঘোষণার তারিখ এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। আরো এক সপ্তাহ লাগবে।’

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির আরেক সদস্য ও বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, ‘সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক—এই তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে।’ এ ছাড়া প্রিভেন্টিভ হেলথকেয়ার নিয়ে বিএনপির বিশদ পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

এমন ইশতেহার ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাহরাইনে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী। একাধিক মিডিয়াকে বলেন, ‘ইশতেহার নিয়ে যেটুকু জেনেছি, এগুলো ভালো কর্মসূচি। আমি মনে করি, গণমুখী কর্মসূচি। আমরা একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চাই। ফ্যামিলি কার্ড, এটা গণমুখী। কৃষকদের যে কার্ডের কথা বলা হচ্ছে, এটা কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নের পরিকল্পনা। এটা ইতিবাচক হিসেবে দেখি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top