সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ‘উচ্চকক্ষ’ গঠিত হবে

election-NM24.jpg

বিশেষ প্রতিবেদক ।।

‘ভিন্নমত’ এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা নিরসনে গণভোটের সময় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে দলগুলোর তীব্র মতভেদের কারণে শেষ পর্যন্ত ‘ভারসাম্যমূলক সমাধান’-এর উপায় খুঁজছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোট আয়োজন এবং সংসদের ‘নিম্নকক্ষে’ দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে ১০০ সদস্যের ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।

গণভোটের সময় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে এরকম ভারসাম্যমূলক সমাধানের চেষ্টায় সরকার  আগামী বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা পর আগামী সপ্তাহে জারি হতে পারে আদেশ।

বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের দিনই গণভোট করতে হবে। দলটির মিত্র দল-জোটগুলোর মতও অভিন্ন। জামায়াতসহ আটটি ইসলামী দলের দাবি- সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোট করতে হবে। সংসদ নির্বাচনের আগেই গণভোট, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশকৃত আকারেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ পাঁচটি দাবিতে এই আটটি দল আজ মঙ্গলবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে সমাবেশ ডেকেছে।

অন্যদিকে, গণভোটের সময় নিয়ে অনঢ় অবস্থানে নেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে গণভোট সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই হতে পারে, অথবা আগেও হতে পারে।

সংসদের ‘উচ্চকক্ষ’ গঠন ইস্যুতেও বিএনপি ও জামায়াত বলয়ের বড় মতবিরোধ রয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, সংসদের নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের পিআর পদ্ধতিতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন হবে। তবে, এব্যাপারে শুরু থেকেই আপত্তি রয়েছে বিএনপির। দলটির প্রস্তাব হলো; ভোটের অনুপাতে নয়, নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন হতে হবে।

গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত জুলাই সনদেও এব্যাপারে বিএনপি ও দলটির মিত্র দলগুলো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ‘ভিন্নমত’ দিয়ে রেখেছে। তবে, জামায়াতসহ আটটি দলের দাবি, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নিম্নকক্ষে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের পিআর পদ্ধতিতেই উচ্চকক্ষ গঠন হতে হবে। এক্ষেত্রে এনসিপির অবস্থানও জামায়াতের মতোই।

‘ভিন্নমত’ এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা
ঐকমত্য কমিশন চূড়ান্ত সুপারিশের সঙ্গে জুলাই সনদের যে কপি যুক্ত করেছে, সেটির সঙ্গে গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত সনদের সঙ্গে বেশকিছু অমিল রয়েছে। বিশেষত, বিভিন্ন প্রস্তাবে স্বাক্ষরিত সনদে থাকা দলগুলোর ‘ভিন্নমত’ তুলে দেওয়া হয়েছে। এটিকে ‘দেশ ও জনগণের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে তাৎণিকভাবেই অভিহিত করেছে বিএনপি ও দলটির মিত্ররা। অন্যদিকে, জামায়াতসহ আটটি দল ও এনসিপির দাবি, ভিন্নমত থাকতে পারবে না। জানা গেছে, এখন এই ‘ভিন্নমত’ ও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’- এই দুটো বিষয় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার।

দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ মনে করছে সরকার
গণভোটের সময় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে দলগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে এক ধরনের ‘চাপ সৃষ্টির কৌশল’ মনে করছে সরকার। এই বিষয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল রবিবার রাজশাহীতে স্থানীয় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ওপর কিংবা আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে কিছু কথা বলে, আবার কিছু মন্তব্য হয়তো আন্তরিকভাবেও আসে।’

সংসদ নির্বাচনের সঙ্গেই কেন গণভোটের ভাবনা
গণভোটের সময় ও উচ্চকক্ষ গঠন ইস্যুতে দলগুলোর এমন অবস্থানের কারণে এই দুটি বিষয়ে ‘ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে সরকার। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারের একজন উপদেষ্টা জানান, সরকারের ভাবনা এমন- উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিএনপি ছাড় দিলে গণভোটের সময়ের বিষয়ে জামায়াতসহ অন্যরা নিজেদের অনঢ় অবস্থান থেকে সরতে পারে।

এছাড়া, সরকার মনে করছে, ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজন করতে গেলে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হবে। সাধারণ ভোটাররাও আগে গণভোটে অংশ নিতে ভোটকেন্দ্রে যেতে তেমন আগ্রহী হবেন না। যেকোনো নির্বাচনে ভোটার টানার ক্ষেত্রে দলীয় ও নির্দলীয় প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকেরা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। গণভোটে কোনো দলীয় বা নির্দলীয় প্রার্থীর সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। ফলে, গণভোটের জন্য ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে কারো আগ্রহ থাকবে না। বিএনপিসহ অনেকগুলো দলের মতের বিরুদ্ধে সাধারণ নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে ওই দলগুলোর নেতা-কর্মীরা মানুষকে সম্পৃক্ত করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাবেন না। বরং নেতিবাচক প্রচারণাও হতে পারে। এছাড়া, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ভোটাররাও কেন্দ্রে গিয়ে ‘না’ ভোট দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে, পুরো সংস্কার প্রক্রিয়াই ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হতে পারে। এসব কিছু বিবেচনায় নিয়েই সরকার মনে করছে, সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের ঝুঁকি অনেক বেশি।

গণভোট কখন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে মতভেদ নিরসনে নিজ উদ্যোগেই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে এক সপ্তাহের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অন্তর্বর্তী সরকার গত ৩ অক্টোবর যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল- সেই সময় শেষ হয়েছে গত সোমবার। দলগুলো নিজেদের উদ্যোগে আলোচনায় বসতে না পারলেও বক্তব্য-বিবৃতিতে প্রায় সব দলই বলেছে, উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। কোনো কোনো দল আরও স্পষ্ট করে বলেছে, উদ্যোগ নিতে হবে প্রধান উপদেষ্টাকেই। যার কারণে, দলগুলো এখন তাকিয়ে আছে প্রধান উপদেষ্টার দিকে। তিনি কী দলগুলোকে ডেকে আলোচনায় বসেন, নাকি মতভেদের ইস্যুগুলোতে নিজের বা সরকারের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন; করলে কী সিদ্ধান্ত দেন- সেটি দেখার অপেক্ষায় দলগুলো।

বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আলোচনা
সরকার-সূত্রে জানা গেছে, দলগুলো নিজেরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিতব্য উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আলোচনা হবে। সেখানে সরকার গণভোট ও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে অথবা সমঝোতার জন্য দলগুলোকে আরও সময় দিতে পারে। এছাড়া, দলগুলোর নেতাদের নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা নিজেই কিংবা উপদেষ্টাদের একটি টিম আবারও আলোচনায় বসবেন- এমন সিদ্ধান্তও আসতে পারে।

আদেশ জারি হতে পারে আগামী সপ্তাহে
গত ২৮ অক্টোবর ঐকমত্য কমিশন সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে যে সুপারিশ জমা দিয়েছে তাতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নামে একটি আদেশ জারির কথা বলা হয়েছে। যাতে বলা হয়, এই আদেশের ভিত্তিতেই হবে গণভোট। তবে, এটা নিয়েও তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে দলগুলোর মধ্যে। জামায়াত ও এনসিপি বলছে- রাষ্ট্রপতি নয়, এই আদেশ জারি করতে হবে প্রধান উপদেষ্টাকে।

অন্যদিকে, বিএনপিসহ দলটির মিত্র দল-জোটগুলোর মতে, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী এই ধরনের কোনো আদেশ জারির এখিতয়ার প্রধান উপদেষ্টার নেই, আদেশ বা অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন কেবল রাষ্ট্রপতি।

জানা গেছে, এবিষয়েও সরকার ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই অধ্যাদেশ জারি করবেন। এর আগে অধ্যাদেশের খসড়া অনুমোদন দেবে উপদেষ্টা পরিষদ। সেক্ষেত্রে, গণভোট আয়োজনে আগামী সপ্তাহেই এই অধ্যাদেশ জারির সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেও ‘হাস্যকর’ মনে করছে বিএনপি
ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, আগামী জাতীয় সংসদ প্রথম ২৭০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে, এই সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করে জুলাই সনদে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ সংযোজন করা না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে। তবে, এব্যাপারে তীব্র আপত্তি তুলেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে সাড়ে আট মাসের ধারাবাহিক সংলাপে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর বিষয়টি আসেনি। এটি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টিকেও ‘হাস্যকর’ মনে করছে বিএনপি। দলগুলোর এমন পরস্পরিবোধী অবস্থানের প্রেক্ষিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদে ২৭০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার না হলে প্রস্তাবসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে যুক্ত হয়ে যাবে বলে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে যেটা বলা হয়েছে সেটি বাদ দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার।

দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগে কয়েক উপদেষ্টা
সামগ্রিক বিষয়গুলো নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের জন্য কয়েকজন উপদেষ্টাকে ইতোমধ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা সরকারের মনোভাব এবং বাস্তব পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করছেন রাজনৈতিক দলগুলোকে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গতকাল সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে নাকি আলাদা সময়ে হবে এই বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সরকার সামষ্টিকভাবে বৈঠকে বসে সিদ্ধান্ত নেবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top